কপিরাইটে আগ্রহ কম

প্রচারণা, সচেতনতার অভাব ও বাধ্যতামূলক নয় বলে কপিরাইটে আগ্রহ নেই বেশির ভাগে সৃজনশীল মানুষের। সমস্যা হচ্ছে না বলে অনেকেই নিবন্ধন করান না। আবার অনেকে বিপদে পড়ে এসে নিজের কাজের কপিরাইট করিয়ে নিচ্ছেন। কপিরাইট অফিস বলছে, মানুষ এর মূল্যটাই বোঝে না।

মেধাস্বত্বের মালিকানাই হচ্ছে কপিরাইট। সাহিত্য, নাট্য, সংগীত, রেকর্ড, শিল্প, চলচ্চিত্র, বেতার সম্প্রচার, টেলিভিশন সম্প্রচার, কম্পিউটার-সফটওয়্যার কর্ম, অর্থাৎ সৃজনশীল মৌলিক কাজের নিবন্ধন করিয়ে নেওয়াই হচ্ছে কপিরাইট। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস আছে। এটি আধা বিচার বিভাগীয় প্রতিষ্ঠান। কপিরাইট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক নয়। তবে নিবন্ধন করা থাকলে মালিকানা নিয়ে আইনগত জটিলতা দেখা দিলে, ‘কপিরাইট নিবন্ধন সনদ’ আইনি সহায়তা পেতে সাহায্য করে।

মেধাস্বত্ব নিবন্ধনের জন্য ফি এক হাজার টাকা। নিজের কাজের সিডি, স্ক্রিপ্ট বা বইয়ের দুই কপি, জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্টের সত্যায়িত কপি ও পাসপোর্ট সাইজের ছবি আবেদন ফরমের সঙ্গে জমা দিতে হবে। আবেদনের এক মাসের মধ্যে নিবন্ধন সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। অনলাইনেও আবেদন করা যাবে।

কোনো লেখক বা প্রণেতার বই বা কোনো সৃষ্টকর্ম যদি কেউ নকল করে, তাহলে দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় প্রতিকার চাইতে পারবেন। শাস্তি হিসেবে কপিরাইট ভঙ্গকারীর চার বছরের জেল ও সর্বনিম্ন ছয় মাসের জেল হতে পারে। সঙ্গে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকার জরিমানা ও সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা জরিমানারও বিধান আছে। তবে চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে এ শাস্তি সর্বোচ্চ পাঁচ বছর ও সর্বনিম্ন এক বছর। আর সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ ও সর্বনিম্ন এক লাখ টাকা জরিমানা রয়েছে। দায়রা জজ আদালতে ফৌজদারি বিচার হবে। জেলা জজ আদালতেও ক্ষতিপূরণ ও নিষেধাজ্ঞার প্রতিকার চাওয়া যাবে।

১৯৬২ সালে কপিরাইট কার্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এ পর্যন্ত মেধাস্বত্বের নিবন্ধন হয়েছে ১৫ হাজার। গত বছরে হয়েছে ৬৩১টি। কপিরাইট অফিসের রেজিস্ট্রার জাফর আর চৌধুরী বলেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে আজ পর্যন্ত কোনো নিবন্ধনই হয়নি। ফটোগ্রাফ নিবন্ধনে এত বছরে কেউ আসেনি। গত ১৩ নভেম্বর প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির প্রেসিডেন্ট আশফাক আহমেদ নিজের একটি ছবি নিবন্ধন করিয়ে নেন। আশফাক আহমেদ বলেন, কপিরাইট নিয়ে তেমন ধারণা ছিল না। তবে এর প্রয়োজন আছে।

ছবি নিয়ে কাজ করে দৃক। দৃকের কিউরেটর এ এস এম রেজাউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, নিবন্ধন জরুরি না। তবে করলে বাড়তি আইনগত সুবিধা পাওয়া যায়।

চলচ্চিত্রে এখন পর্যন্ত ৭২টি নিবন্ধন হয়েছে। কপিরাইট অফিসের রেজিস্ট্রার বলেন, কপিরাইট করা থাকলে পাইরেসি রোধেও আইনি সহায়তা পাওয়া যায়। চলচ্চিত্রকার মোরশেদুল ইসলাম বলেন, ‘ফিল্ম মেকাররা আগ্রহী না। কেন তা জানি না। আমি নিজেও করিনি। যেহেতু সমস্যা হয়নি। তাই হয়তো কেউ আগ্রহ বোধ করে না।’ তবে তিনি বলেন, সমস্যা হলে কপিরাইট করা থাকলে উপকার পাওয়া যায়। এটা নিয়ে এখনো সেভাবে সচেতনতা গড়ে ওঠেনি। তবে কপিরাইট করা উচিত।

গীতিকার কবির বকুল কপিরাইট বিষয়ে বললেন, সচেতনতার অভাব। তিনি বলেন, ‘ইউটিউব, রিংটোন ডাউনলোড থেকে শুরু করে যেসব ক্ষেত্রে গান ব্যবহার করা হয়, সেখানে রয়্যালটি নির্ধারণ করা থাকে না। অন্তত আমি পাইনি। এককালীন টাকা দেওয়া হয়।’ তিনি বলেন, একটি গানের প্রথম মালিকানা হলো গীতিকার ও সুরকারের। কিন্তু বাংলাদেশে এখন স্বেচ্ছাচারিতা চলছে। গান করতে গেলে এখন আগেই চুক্তি করিয়ে নেওয়া হয়। এই গীতিকার বলেন, আইন সম্পর্কে ভালোভাবে না জানার কারণেই হয়তো গানের ক্ষেত্রে অরাজকতা চলছে।

সবচেয়ে বেশি কপিরাইট নিবন্ধন হয় সাহিত্যকর্ম। গত বছর হয়েছে ৩২২টি। লেখক হায়াৎ মামুদ বলেন, কপিরাইট আইন আছে। তবে অনেকেই এর ব্যাপারে তেমন সচেতন না। আরেকজন লেখক জ্যোতি প্রকাশ দত্ত বলেন, কপিরাইট আইন লঙ্ঘনের ফলে কোনো প্রকাশকের শাস্তি হয়েছে কি না, জানা নেই। নিজেদের সচেতনতার পাশাপাশি আইনের প্রয়োগটাও ঠিকমতো হতে হবে।

কপিরাইট আইন সংশোধনের জন্য একটি খসড়া তৈরি হয়েছে। কপিরাইট অফিসের রেজিস্ট্রার জাফর আর চৌধুরী বলেন, এ মাসের মধ্যেই খসড়াটি কেবিনেটে পাঠানো হবে। খসড়ায় তাঁরা টাস্কফোর্স ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সুপারিশ রেখেছেন।

নিবন্ধন কম হওয়ার কারণ হিসেবে এই রেজিস্ট্রার বলেন, সচেতনতা কম। এ ছাড়া প্রচারণার জন্য আলাদা কোনো বাজেটও নেই। যেহেতু এটা ঐচ্ছিক একটি বিষয়, তাই যাঁর স্বত্ব, তাঁর ওপর নির্ভর করে।

About Kuy@s@News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*